পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ জামায়াতের ১৫ দফা দাবি
ছবি সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, একের পর এক কারখানা বন্ধ এবং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল শ্রমিক-মালিক বিরোধের বিষয় নয়; এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকট।
তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের ব্যয় বাড়লেও শ্রমিকদের আয় ও জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। ফলে একজন শ্রমিকের মাসিক আয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার। শ্রমিকের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডের প্রথম সভার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দেবে বলে তারা আশা করেন। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা ও উৎপাদন ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, কারখানা ধ্বংস করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এতে শ্রমিকরা কর্মসংস্থান হারান, মালিকেরা বিনিয়োগ হারান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।
চলমান শ্রম অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী কোনো মহল উসকানি বা নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তার বন্ধের আহ্বান জানান।
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনাও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, কারা দায়ী এবং কোন পরিস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। দায়ীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহত ও আহতদের পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দিতে হবে।
পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।
এ ছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে শতাধিক পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রয়াদেশ বাতিল, পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারের প্রতি জামায়াতের ১৫ দফা দাবি:
1. শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করতে হবে।
2. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা ও নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
3. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নাশকতায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
4. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।
5. গ্রেপ্তার হওয়া নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি দিতে হবে এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
6. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
7. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তায় শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
8. সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করতে হবে।
9. শ্রমিকদের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ বা অন্য কোনো মহলের উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করতে হবে।
10. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু করে শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
11. অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।
12. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।
13. শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
14. নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
15. পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন, শ্রমিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার, নিরপরাধ শ্রমিকদের মুক্তি এবং বন্ধ কারখানাগুলো চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মালিকদেরও শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ নয়, বরং শিল্পের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন